লাগামহীন স্বর্ণের দাম কমছে বেচা-কেনা

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়েই চলেছে। বিশ্ববাজারের প্রভাবে দেশেও হু-হু করে বাড়ছে দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রি অনেক কমে গেছে।

বুধবার ( ০৮ অক্টোবর ) ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম উঠেছে। আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এতে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম উঠেছে প্রতি ভরিতে দুই লাখ ৯ হাজার টাকার ওপরে।

দেশের বাজারে এক মাস আগে অর্থাআগস্টে এক ভরি স্বর্ণের যে দর ছিল, তার থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে এখন। বেড়ে গেছে ২০ শতাংশের মতো। সোনার গহনা কিনতে এসে দাম শুনে হিমশিম খাচ্ছেন ক্রেতারা। তাদের বর্তমান মূল্যতালিকা দেখাচ্ছেন বায়তুল মোকারম মার্কেটের এক দোকানি

গত ৩০ আগস্ট ২২ ক্যারেটের প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দর ছিল ১৪ হাজার ৯৪৫ টাকা। সবশেষ বুধবার তা হয় ১৭ হাজার ৯২৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি গ্রামে বেড়েছে ২ হাজার ৯৮২ টাকা বা ১৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এতে এক ভরিতে (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৩৪ হাজার ৭৮২ টাকা। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু দেশে নয়, গোটা দুনিয়ার কোথাও কোনো পণ্যের দাম এতটা বাড়েনি। কিন্তু এর কারণ কী?

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে স্বর্ণ ধরে রাখতে তাদেরও দাম বাড়াতে হয়েছে, না হয় সব স্বর্ণ চলে যাবে সীমান্তের বাইরে অন্য কোনো দেশে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে সার্বিকভাবে স্বর্ণ কেনা-বেচা ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশের মতো কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা

ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীল সময়ে সোনাকে ‘মূল্য সংরক্ষণের’ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়এবছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ, ২০২৪ সালে যা ছিল ২৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির পারদ কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউিইয়র্ক সুদহার কমিয়ে দেওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। এতে ডলারের দরও কমে যাচ্ছে। মুনাফা ধরে রাখতে কয়েকটি দেশ ফেডারেল রিজার্ভের এই সিদ্ধান্তে স্বর্ণে বিনিয়োগ শুরু করেছে।

ফ্রান্স ও জাপানে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলমান থাকায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, ইউক্রেইন সংঘাত, ফ্রান্স ও জাপানের রাজনৈতিক অস্থিরতাÑএসব কিছুও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়াচ্ছেকয়েকটি দেশ ডলারের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রা বিনিময় হার ধরে রাখতে স্বর্ণের মজুতও করে চলছে

সেই তালিকায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে চীনএমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতও স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে। তাতে বাংলাদেশেও স্বর্ণের বার ও গয়না প্রবেশে খরচ বেড়েছে ব্যবসায়ীদের

এদিকে স্বর্ণের দাম হু-হু করে বেড়ে যওয়ায় বেচা-বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বর্ণ কেনার প্রবণতা নেই বললেই চলে। শখের বশে তো দূরের কথা, বিয়েসাদিতেও আগের মতো স্বর্ণ কিনছেন না কেউ। স্বর্ণের বিকল্প খুঁজছেন তারা।

স্বর্ণের বার গলিয়েপুরোনো গয়না নতুন করে তৈরির কারিগর সবচেয়ে বেশি পুরান ঢাকার তাঁতী বাজারে। এরপরই বেশি পরিচিত বায়তুল মোকাররম গয়নার বাজার।

এ দুটি বাজার ও গুলশানের কয়েকটি শপিং মল ঘুরে স্বর্ণ কেনা-বেচায় মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। এক্ষেত্রে পুরোনো ও বেশ পরিচিত দোকানে ক্রেতা সমাগম বেশি দেখা গেছে।

বায়তুল মোকাররম রিয়া জুয়েলার্সের বিক্রয়কর্মী নূরে বুলবুল রনি বলেন, বেশিরভাগই আসছেন পুরোনোটার সঙ্গে আরও কিছুটা যোগ করে নতুন নকশার গয়না গড়িয়ে নিতে। একেবারে নতুন যারা কিনছেন, তারা বেশিরভাগই এক ভরি ওজনের কিনছেন।

ক্রেতা উপস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, সার্বিকভাবে বললে, মানুষ আসা কমেছে। আগে ছয় দিনই ব্যবসা করলেও এখন সেভাবে হচ্ছে না। যাদের সামর্থ্য আছে, তারাই আসছেন। হয়তো মনে করছেন, আরও দাম বাড়বে, তাই কিনতে আসছেন।’

পছন্দের নকশার বাউটি খুঁজতে খুঁজতে মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন বিয়ে করেছি। আগেও গয়না দেয়া আছে। এখন দাম বেড়ে যাচ্ছে শুনে অন্য খরচ বাদ দিয়ে ছোট গয়না কেনার আবদার। তাই নিয়ে আসছি, পরে দেখা যাবে।’

দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের অনেকেই আসছেন এরকম ছোট গয়না কিনতে। কানের দুল, আংটি, নাকফুলটিকলির দরদাম করতে দেখা গেছে ক্রেতাদের

আমিন জুয়েলার্সেরশাখার ব্যবস্থাপক বকুল দেবনা বলেন, ‘ছয় দিনের দোকানদারিতে কোনোদিন বিক্রি বাড়ে তো, আবার কোনো দিন কমে যায়। সব ভালো-মন্দ নিয়ে আছি।

তবে ক্রেতা আমার কমে গেছে ৩০ শতাংশের মতো। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে মধ্যবিত্তরা তো কখনোই সোনার জিনিস কিনতে পারবে না।’

বায়তুল মোকাররমের গ্রামীণ জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী জাহিদুর রহমান বলেন, ‘দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ নতুন গয়না কিনছে বেশিপুরোনো গয়না বিক্রি কমে গেছেদিন গেলেই তো দাম বাড়ছে, কে বিক্রি করবে বলেন।’

এখন স্বর্ণের সরবরাহ কমে গেছে। নতুন স্বর্ণের বার আগের মতো পাচ্ছি না। দোকান খালি হচ্ছে বেশি, ঢুকছে কম।’ এই স্বর্ণ ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা তো আমদানি করি না। বেশি আসে হাতে হাতে। সেখান থেকে বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যা পাই, তাই কিনি। দাম তো তারাই ঠিক করে। তারা স্বর্ণের বার বিক্রি করে, আমরা গয়না বানাই। তারা তো বানায় না।’ ঢাকায় যেমন ক্রেতা কমেছে, তেমনি কমেছে সারাদেশেও