এস এম ফরহাদ আহমেদ:
এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরপর দুটি পরিচালনা পর্ষদ সভায় কোম্পানির চেয়ারম্যান কিবরিয়া গোলাম মোহামাদের স্ত্রী হোসনে আরা বেগমের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোম্পানির পরিচালক, কর্মকর্তা বা আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড সভায় অংশগ্রহণের অনুমোদিত ব্যক্তি না হয়েও তিনি দুটি সভায় উপস্থিত ছিলেন বলে কোম্পানির নিজস্ব ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে। যা কোম্পানি সচিবও নিশ্চিত করেছেন। কোনো ব্যক্তি কোম্পানির পরিচালক বা অনুমোদিত কর্মকর্তা না হয়েও পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থিত থেকে আলোচনায় বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সম্প্রতি ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এম. মাহফুজুর রহমান। তাঁর পদত্যাগের পর কোম্পানিটির পরিচালনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পরবর্তীতে পরিচালক শহীদ-ই-শিরিন শারমিনকে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ জুলাই প্রধান কার্যালয়ের বোর্ডরুমে এনআরবি ইসলামিক লাইফের পরিচালনা পর্ষদের ২৭তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কোম্পানির চেয়ারম্যান কিবরিয়া গোলাম মোহামাদ।
সভায় ভাইস চেয়ারম্যান শহীদ-ই-শিরিন শারমিনসহ পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্য এবং কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ জামাল হাওলাদার উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মো. আবু হাসান ও কোম্পানি সেক্রেটারি মো. সালাহউদ্দীনও সভায় অংশ নেন।
ওই সভায় কোম্পানির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে কোম্পানির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত সভার ছবিতে চেয়ারম্যানের স্ত্রী হোসনে আরা বেগমকেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
এরপর গত ১৭ আগস্ট কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ২৮তম সভা একই বোর্ডরুমে অনুষ্ঠিত হয়। এ সভাতেও চেয়ারম্যান কিবরিয়া গোলাম মোহাম্মদের সভাপতিত্বে কয়েকজন পরিচালক, ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবং কোম্পানি সেক্রেটারি উপস্থিত ছিলেন। কোম্পানির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই সভার ছবিতেও হোসনে আরা বেগমকে দেখা যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনআরবি ইসলামিক লাইফের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. সালাহউদ্দীন বলেন, হোসনে আরা বেগম বোর্ড সভায় মূলত চা খাওয়ার জন্য উপস্থিত থাকেন।
তিনি বলেন, “ম্যাডাম অনেক ভালো লোক। তিনি আসলে চা খাওয়ার জন্য মিটিংয়ে উপস্থিত থাকেন। অবশ্য আইনগতভাবে বিষয়টি নিয়মবহির্ভূত।”
তবে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আলোচনা বা সভার কার্যক্রমে হোসনে আরা বেগমের কোনো ধরনের অংশগ্রহণ ছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।
বীমা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একটি বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা। ফলে কোম্পানির পরিচালক বা অনুমোদিত কর্মকর্তা নন এমন কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি, বিশেষ করে নিয়মিত উপস্থিতি বা সভার কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অভিযোগ থাকলে তা করপোরেট গভর্ন্যান্সের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
পরিচালক হওয়ার প্রস্তাব নাকচ:
এর আগে হোসনে আরা বেগমকে এনআরবি ইসলামিক লাইফের পরিচালক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালে রোমা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে কোম্পানির পরিচালক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরীর নামে থাকা এনআরবি ইসলামিক লাইফের শেয়ার হোসনে আরা বেগমের নামে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি আইন ও বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন না হওয়ায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ওই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি।
আইডিআরএর সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এনআরবি ইসলামিক লাইফের দুই পরিচালকের শেয়ার হস্তান্তরসংক্রান্ত প্রস্তাব কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে।
তিনি বলেন, “রোমা এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি হিসেবে হোসনে আরা বেগমের নামে যে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছিল, সেটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় ও আইনসম্মতভাবে না হওয়ায় কর্তৃপক্ষের সভায় বাতিল করা হয়েছে।”
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পরে শেয়ার হস্তান্তরের জন্য অন্য একজনের নামে একটি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সিআইবি প্রতিবেদনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ায় শেয়ার হস্তান্তর কার্যক্রম এখনো সম্পন্ন হয়নি।
পরিশোধিত মূলধন নিয়ে প্রশ্ন:
এনআরবি ইসলামিক লাইফের পরিশোধিত মূলধন ১৮ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মূলধন পুনর্ভরণের শর্তে কোম্পানি থেকে একপর্যায়ে ৭ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।
আইডিআরএর একটি সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে প্রায় এক বছর আগে ৩ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনে পুনঃসংযোজন করা হয়েছে। তবে বাকি ৪ কোটি টাকা এখনো পুনর্ভরণ করা হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে কোম্পানির বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পরিপালনের প্রশ্নও উঠেছে।
অনিয়মের অভিযোগে ভাইস চেয়ারম্যানের পদত্যাগ:
কোম্পানির পরিচালনা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এম. মাহফুজুর রহমান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।
আদালতের আদেশে দায়িত্বে সিইও:
এদিকে, এনআরবি ইসলামিক লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মো. শাহ জামাল হাওলাদার। তাঁর নিয়োগ নবায়নের আবেদন আইডিআরএ অনুমোদন না করায় বিষয়টি আদালতে গড়ায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক অনিয়ম, অপচয় এবং কোম্পানি ও গ্রাহকের স্বার্থের পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁর নিয়োগ নবায়নের আবেদন নাকচ করেছিল আইডিআরএ। তবে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন শাহ জামাল হাওলাদার।
বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, কোনো বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন।
আইডিআরএর সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে মো. শাহ জামাল হাওলাদার ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন।
পরে উচ্চ আদালত আইডিআরএর না-মঞ্জুরসংক্রান্ত চিঠির কার্যকারিতা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি এবং অদৃশ্য কারণে শুনানিও ঝুলে আছে।
এ বিষয়ে আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন।
তিনি বলেন, “মামলাটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এ বিষয়ে আইডিআরএর নিয়োজিত আইনজীবীরা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”
এনআরবি লাইফের চেয়ারম্যান কিবরিয়া গোলাম মোহামাদ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ইতালি শাখার প্রতিষ্ঠাতা এবং অল ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইসেন্স বাগিয়ে নেন। কিবরিয়া গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জি এম কিবরিয়ার স্ত্রী হোসনে আরা বেগম ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহপাঠী ও বান্ধবী। হোসনে আরা বেগম ইউরোপীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন।
সূত্র: ব্যাংক বীমা অর্থনীতি
















